Showing posts with label Open discuss. Show all posts
আদালতের মৌলিক কাজ হচ্ছে অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে এসে শাস্তি বিধান করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্টা করা। আইনের আশ্রয় নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সুবিচার পাবে এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু মাঝে মাঝে দেখা যায় প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে হেয় করতে বা হয়রানি করতে মিথ্যা মামলা রুজু করা হয়।

পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে এ ধরনের খবর। সাক্ষী সাজিয়ে মামলা উপস্থাপন করায় প্রতিপক্ষ হয়রানির মুখোমুখো হন । এছাড়া মামলা চালাতে গিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। আমরা দেখার চেষ্টা করব এ সম্পর্কে আইন কী বলে।
ফৌজদারী কার্যবিধির ২৫০ ধারা উপধারা (১) অনুসারে কোন মামলা যদি নালিশের মাধ্যমে অথবা পুলিশের বা ম্যাজিষ্ট্রেট কাছে তথ্য প্রদান করার মাধ্যমে করা হয় এবং পরবর্তীতে যদি ম্যাজিষ্ট্রেট অভিযুক্ত বা একাধিক অভিযুক্তের কাউকে খালাস দেন এবং ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে প্রতীয়মান হয় যে , অভিযোগগুলো মিথ্যা ও হয়রানিমূলক তাহলে কেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না এই মর্মে উক্ত অভিযোগকারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে পারেন।

অভিযোগকারী আদালতে অনুপস্থিত থাকলে আদালত হাজির হয়ে কারণ দর্শানোর জন্য সমন জারী করতে পারেন ।

উপধারা (২) অনুসারে, অভিযোগকারী কারণ দর্শানোর পর ম্যাজিষ্ট্রেট যদি মনে করেন আনীত অভিযোগগুলো মিথ্যা ও হয়রানিমূলক তাহলে সর্বোচ্চ ১০০০ হাজার টাকা জরিমানা করতে পারেন।

এক্ষেত্রে তৃতীয় শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট হলে জরিমানার পরিমাণ হবে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। জরিমানার অর্থটি মামলায় বিবাদীকে পরিশোধ করতে হবে।

জরিমানা অনাদায়ে ম্যাজিষ্ট্রেট সর্বোচ্চ ৩০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করতে পারেন।

এছাড়া Law of Torts অনুসারে বিদ্বেষপরায়ণ মামলার ক্ষেত্রে প্রতিকার পেতে চাইলে বাদীকে প্রমাণ করতে হবে যে,

(ক) বিবাদী তার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল

(খ) পূর্বের মামলার প্রকৃতি দেখে মনে হয় , মামলাটি বাদীর অনুকূলে শেষ হতে পারত
(গ) মামলাটি যুক্তিসংগত এবং সম্ভাব্য কারণ ছাড়া করা হয়েছিল
(ঘ) মামলাটি বিদ্বেষবশত করা হয়েছিল
(ঙ) মামলার ফলে বাদীর ক্ষতি হয়েছে
এখানে উল্লেখ্য যে, কোন মামলায় যদি কাউকে দণ্ডিত করা হয়, তবে দণ্ডিত ব্যক্তি ঐ দণ্ডাদেশকে বিদ্বেষবশত বলে বাদীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে না।

দণ্ডবিধির ১৯৩ ধারা অনুসারে বিচারিক প্রক্রিয়ার কোন পর্যায়ে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে বা সাক্ষ্য বিকৃত করলে ঐ ব্যক্তি সাত বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে বা সাক্ষ্য বিকৃত করলে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

দণ্ডবিধিরি ১৯৪ ধারা অনুসারে যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা সাক্ষ্য বা সাক্ষ্য বিকৃত করে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য কোন অপরাধে কাউকে দণ্ডিত করায়, সেক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন । এক্ষেত্রে মিথ্যা সাক্ষ্য বা সাক্ষ্য বিকৃত করার ফলে যদি নির্দোষ ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, তাহলে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকারী মৃত্যুদণ্ড বা ১৯৪ ধারায় বর্ণিত অন্যান্য দণ্ডে দণ্ডিত হবেন ।

দণ্ডবিধির ১৯৫ ধারায় উল্লেখ আছে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা সাক্ষ্য বা সাক্ষ্য বিকৃত করে কাউকে এমন কোন অপরাধে দণ্ডিত করায় যার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সাত বছরের কারাদণ্ড, তাহলে উক্ত ব্যক্তিও সমদণ্ডে দণ্ডিত হবেন ।
এছাড়াও তথ্য প্রমাণ গোপন করা, অপরাধ সংগঠনের মিথ্যা সংবাদ প্রদান করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এসব ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলাও করতে পারেন।
- বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
বর্তমানে যে কোনো ব্যক্তির মনে হঠাৎ গুম বা গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কা থাকাটা স্বাভাবিক।

এরই মধ্যে অনেকে গুম কিংবা বা গ্রেফতারের নামে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। পরে তাদের ব্যাপারে আর কিছুই জানা যায়নি। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পরও তারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কোনো খোঁজ দিতে পারেনি।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়, মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামেই কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর সেই ব্যক্তির আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট থানা বা নিকটস্থ প্রশাসনের সাহায্য নিতে গেলে তারা এর কোনো দায়ভারও স্বীকার করে না। কখনো হয়তো নিরুদ্দেশ ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায় কখনো বা তাও মেলে না। কিছু দিন আগেও ঢাকা থেকে গুম হওয়া তিনজনের হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করা হয়। যাদের গ্রেফতারের নামে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।

আমদের দেশে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো পুলিশ অফিসার ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ বা ওয়ারেন্ট ছাড়াই কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারবে। অর্থাৎ পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহ হলেই যে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে আটকে রাখতে পারবে। এই ধারা পুলিশকে স্বেচ্ছাচারিতা করার সুযোগ দিয়েছে। ইচ্ছা মতো যাকে তাকে যখন তখন পুলিশ সন্দেহ করতে পারে। এর জন্য পুলিশকে কোনো জবাবদিহিও করতে হয় না। আমরা সাধারণ নাগরিক এই ক্ষেত্রে তাদের কাছে অসহায়। যেন স্বাধীন দেশে থেকেও পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি আমরা। এই ধারায় পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারকে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ম্যাজিস্ট্রেটের ওয়ারেন্ট ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার নিয়ম নেই। তাছাড়া ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতার ক্রিমিনাল জুরিস্প্রুড্যান্সও সমর্থন করে না। ৫৪ ধারায় আটক ব্যক্তি প্রায়ই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন। যার প্রমাণ আমরা কম বেশি দেখে আসছি। এমন কি পুলিশ হেফাজতে অনেক বন্দির মৃত্যুর কারণও এই ধারায় প্রদত্ত অসীম ক্ষমতা। এই ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহার জনগণের জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে ব্যাহত করে। যা সরাসরি আমাদের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৫৪ ধারায় গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ ছাড়াই চালান করে দেওয়া হয় যা অমানবিক ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে থাকে।

সন্দেহের বশবর্তী হয়ে গ্রেফতারের এই নিয়ম নিয়ে এরই মধ্যে আমাদের দেশে অনেকবার সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অনেক আগে থেকেই এই ধারা বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকরা জোর দাবি জানিয়ে এলেও কোনো সরকার এই ধারা বাতিল কিংবা সংশোধন করার উদ্যোগ নেয়নি। মাঝে মধ্যে মন্ত্রীরা নানা আশার কথা শোনালেও তারা এই ধারা মূলত বিরোধী দলকে দমন ও অপছন্দের ব্যক্তিদের শায়েস্তা করতে ব্যবহার করেছেন।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারার অধীনে পুলিশের আটক সংক্রান্ত ব্যাপারে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ BALST Vs. BANGLADESH (55 DLR 363) মামলায় সরকারকে আটটি নির্দেশনা মেনে চলার সুপারিশ করে। সুপারিশগুলো হলো-
১.বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ সালের তিন ধারার অধীনে কোনো ব্যক্তিকে আটক করার জন্য পুলিশ কর্মকর্তা ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করতে পারবে না। ২. গ্রেফতারের সময় একজন পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় প্রদান করবে এবং যদি প্রয়োজন হয়, তবে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে ও উপস্থিত সবাইকে তার পরিচয়পত্র (ID Card) প্রদর্শন করবে। ৩. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে থানায় আনার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তা তাকে গ্রেফতারের কারণ নথিভুক্ত করবে এবং আনুষঙ্গিক তথ্য যেমন, আমলযোগ্য অপরাধে ওই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে তার নিজের জ্ঞান, অপরাধের প্রকৃতি, যে পরিস্থিতিতে তাকে গ্রেফতার করা হলো, তথ্যের উৎস, ওই তথ্য বিশ্বাস করার কারণ, যেখান থেকে গ্রেফতার করা হয় সে জায়গার বর্ণনা, গ্রেফতারের তারিখ ও সময় সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ, ওই ব্যক্তির নাম ও ঠিকানা এবং এই উদ্দেশের জন্য থানায় রক্ষিত সাধারণ ডায়েরিতে তা উপস্থাপন করতে হবে। ৪. গ্রেফতারের সময় গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেলে পুলিশ কর্মকর্তা তা রেকর্ড করে রাখবেন এবং ওই ব্যক্তিকে নিকটস্থ হাসপাতালে বা সরকারি চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাবেন এবং ওই আঘাতের কারণে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার সার্টিফিকেটও সংগ্রহ করবেন। ৫. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে থানায় চালানের তিন ঘণ্টার মধ্যে তাকে গ্রফতারের কারণ জানাতে হবে। ৬. যদি কোনো ব্যক্তিকে তার বাড়ি বা অফিস থেকে গ্রেফতার করা না হয়, তাহলে তাকে গ্রেফতারের এক ঘণ্টার মধ্যে তার কোনো আত্মীয়কে টেলিফোনে বা বার্তাবাহকের মাধ্যমে জানাতে হবে। ৭. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে তার পছন্দের আইনজীবী বা তার ইচ্ছানুযায়ী কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে দিতে হবে ৮. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে নিকটবর্তী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করাতে হবে এবং তখন পুলিশ কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট আবেদন পত্রে উল্লেখ করতে হবে, কেন তদন্ত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হয়নি, কেন তিনি মনে করেন যে তার অভিযোগের বা তথ্যের সুস্পষ্ট ভিত্তিমূল রয়েছে-যদি এমন অবস্থার প্রয়োজন পড়ে। এই মামলার প্রাসঙ্গিক তথ্যের অন্তর্ভূক্তির কপি মামালার ডায়েরির BP from No.38 একই ম্যাজিস্ট্রেটকে হস্তান্তর করতে হবে।

এছাড়া ভুয়া পরোয়ানা দেখিয়ে আটক বন্ধে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না জানতে চেয়ে চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি সরকারের প্রতি হাইকোর্টের তিন সপ্তাহের রুল জারি হয়।

কিন্তু হাইকোর্টের এই সব নির্দেশনা যদি পুলিশ সঠিকভাবে মেনে চলতো তাহলে গ্রেফতারের সময় সাধারণ নাগরিকদের এতো দুর্ভোগ পোহাতে হতোনা। মানুষেরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর অনেক আস্থা থাকতো। অন্য কেউ পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ পরিচয় দিয়ে সহজে কোনো সাধারণ নাগরিককে গুম বা গ্রেফতার করার সুযোগ পেতো না। আর এই ব্যাপারে আমাদেরও সচেতন হতে হবে। আশেপাশের পরিচিত কেউ অজ্ঞাত কারণে গ্রেফতার হলে দেখতে হবে, কে বা কারা গ্রেফতার করছে বা তাকে গ্রফতারের নামে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আশা করি, হাইকোর্টের দেওয়া গ্রেফতার সম্পর্কিত এই সব নির্দেশনা পুলিশ সঠিকভাবে পালন করলে দেশে গুম বা গুপ্ত হত্যা কিংবা অবৈধ গ্রেফতারের মতো ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে।
- বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
এপ্রিলের ৫ তারিখ থেকে সরকার, ক্ষমতাসীন মহাজোট ও তাদের নানা বর্ণের ছায়াসংগঠন মিলে রাজধানী ঢাকাকে দেশের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। শাহবাগি, ঘাদানিক, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম এবং সরকারপন্থী বামরা শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সন্ধ্যা থেকে ২৪ ঘণ্টার নজিরবিহীন হরতাল, অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করলেও সরকারি নীতিনির্ধারকরা তার কার্যকারিতা নিয়ে সঙ্গত কারণেই নিশ্চিত হতে পারেননি। অতএব, পুরো প্রশাসনকে নির্লজ্জভাবে মাঠে নামানো হয়েছিল হেফাজতে ইসলামের ঢাকাগামী কাফেলা ঠেকাতে।

আরিচা ও মাওয়ায় ফেরি পারাপার বন্ধ রাখা হলো, ডিসি-এসপি-ইউএনওরা বাস মালিকদের রুট পারমিট বাতিলের ভয় দেখিয়ে বাস চলাচলে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন, দক্ষিণের সব জেলার লঞ্চ আটকে দেয়া হলো, সর্বশেষ নিরাপত্তাহীনতার বায়বীয় অজুহাতে নজিরবিহীনভাবে আন্তঃজেলা ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হলো। উদ্দেশ্য একটাই, ঢাকায় হেফাজতের কাফেলা যেন কোনো অবস্থাতেই পৌঁছাতে না পারে। মহাসমাবেশের অনুমতি দিয়েও লংমার্চে নানা পন্থায় বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মহল তাদের মোনাফেকি চরিত্রের প্রমাণ দিতে কোনোরকম দ্বিধাবোধ করেনি।

গত দশ বছরে দুই ক্ষমতাসীন সরকারের এ ধরনের হঠকারি কাজ-কারবারের আরও দুটি উদাহরণ প্রসঙ্গক্রমে এ মুহূর্তে মনে পড়ছে। ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের তত্কালীন সাধারণ সম্পাদকের কৌতুককর ট্রাম্প কার্ডের হুমকিতে বিচলিত হয়ে চারদলীয় জোট সরকার বাইরের জেলাগুলো থেকে লোকজনের ঢাকা আগমন বাধাগ্রস্ত করতে চেয়েছিল। তবে সেবার ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করার চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় পা রাখলেই গণগ্রেফতারের অস্ত্রটা অধিক ব্যবহার করেছিল। ট্রাম্প কার্ডটাই ভুয়া হওয়ার কারণে রাজধানীতে অস্বাভাবিক হারে যাত্রী আগমন না ঘটলেও সরকারের তুঘলকি আচরণে বেশকিছু নিরপরাধ মানুষকে খামোকা হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। দ্বিতীয় উদাহরণটি বর্তমান সরকারের আমলেই। ২০১২ সালের ১২ মার্চ বিএনপির ঢাকায় মহাসমাবেশকে ঘিরেও শেখ হাসিনার প্রশাসন একইভাবে ঢাকা অবরোধ করেছিল। তবে সেবার সরকার অন্তত হরতাল ডাকা পর্যন্ত যায়নি। সরকারের ইন্ধনে এবার ছাত্রলীগ, যুবলীগের ক্যাডারদের জনবল ও অস্ত্রের ভরসায় ভারতের চিহ্নিত দালাল ব্যক্তিবর্গ হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ প্রতিহত করা এবং মঞ্চ দখলের ঘোষণা দেয়ার ধৃষ্টতাও দেখিয়েছে। কিন্তু উলঙ্গ সরকারের লাজলজ্জাহীন কাজকর্মের ফল হয়েছে উল্টো।

বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে এপ্রিলের ৬ তারিখে স্মরণকালের সর্ববৃহত্ মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে দেখে ঢাকাবাসী আবেগ ও বিস্ময়ে যথাক্রমে আপ্লুত ও বিমূঢ় হয়েছে। সকাল থেকেই বঙ্গোপসাগরের অন্তহীন ঢেউয়ের মতো তৌহিদি জনতার মিছিলের পর মিছিল আছড়ে পড়েছে রাজধানীর সমতটে। অযুত কণ্ঠের আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়েছে এই বিশাল নগরী। অভাবনীয় ইসলামি জাগরণদৃষ্টে আমরা, বিশ্বাসীরা উদ্বেলিত হয়েছি। দীর্ঘকালের ফেলে রাখা রুক্ষ, শুষ্ক ঈমানি জমিতে বর্ষার অবিরাম ধারার মতো আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের ৪২ বছরের ইতিহাসে কেবল দু’টি জনসমাবেশের সঙ্গে হেফাজতের এই লংমার্চের তুলনা করা চলে। প্রথমটিতে আমি নিজেই উপস্থিত ছিলাম। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে এসেছিলেন। প্রিয় নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সেই মহাসমাবেশে সারা দেশ থেকে অসংখ্য মানুষ ভেঙে পড়েছিল চোখে পানি এবং অন্তরে গভীর ভালোবাসা নিয়ে। আঠারো বছর বয়সের আবেগ নিয়ে ঝাপসা চোখে আমিও সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম। বাংলাদেশের মানুষের চোখে সেদিনের শেখ মুজিব এবং স্বৈরাচারী একদলীয় বাকশালের জন্মদাতা যে এক ব্যক্তি ছিলেন না, সেটি ভিন্ন আলোচনা। দ্বিতীয় ঘটনার সময় আমি চট্টগ্রামে কর্মরত থাকায় উপস্থিত থাকার সুযোগ পাইনি। ১৯৮১ সালের জুন মাসের ২ তারিখে বাংলাদেশের জনগণ আবারও দু’চোখ ভরা অশ্রু এবং হৃদয়ে হাহাকার নিয়ে মানিক মিঞা এভিনিউ সংলগ্ন এলাকা একাকার করে ফেলেছিল। ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত প্রেসিডেন্ট জিয়ার জানাজায় লোকসমাগমের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো ক্ষমতাসীন নেতার এ ধরনের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা নিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ আজ পর্যন্ত নসিবে ঘটেনি। ভবিষ্যতে কখনও ঘটবে কি-না সেটা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তবে এখন পর্যন্ত সেরকম কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কারণ জেনারেল জিয়া শহীদ হওয়ার পর কোনো নেতার পক্ষেই জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে তার কাছাকাছি উচ্চতায় পৌঁছানোও সম্ভব হয়নি।

গত শনিবার ঢাকাবাসী তৃতীয়বারের জন্য জনমহাসমুদ্রের প্লাবন দেখেছে। প্রথম দু’বারের মতো এবারও আবেগ কাজ করেছে এই অসংখ্য মানুষকে একত্রিত করতে। আমাদের মহানবী (সা.) সম্পর্কে কতগুলো চরম ইসলামবিদ্বেষী, ইঁচড়ে পাকা শাহবাগি ব্লগারের কুত্সা রটনায় এদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান যে বেদনা অনুভব করেছে, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ঢাকামুখী কাফেলার জোয়ার এবং মেহমানদারির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ ঢাকাবাসীর আবেগের মধ্য দিয়ে। তবে তিন জনসমুদ্রে এক আবেগ ছাড়া আর কোনো মিল নেই। অমিলের দিকগুলো খানিক দেখে নেয়া যাক। প্রথম দুই ঘটনায় অংশগ্রহণকারীদের কোনোরকম বাধা প্রদান করা হয়নি। এবার যত প্রকারে সম্ভব ঢাকামুখী জনস্রোতকে আটকানোর অপচেষ্টা করা হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, সরকার যেন কোনো আক্রমণকারী সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রতিবাদী ধর্মপ্রাণ মানুষকে রুখে দেয়া সম্ভব হয়নি। কুমিল্লা, কালিয়াকৈর, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী থেকে মিছিলের পর মিছিল পায়ে হেঁটে হাজির হয়েছে শাপলা চত্বরে। রসুলভক্ত মুসাফিরদের একটুখানি সেবা প্রদানের জন্য ঢাকার প্রতিটি প্রবেশপথের দু’ধারে সাধারণ নাগরিক আকুল হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে। কারও হাতে পানির বোতল, সামর্থ্য অনুযায়ী কেউবা ফল-মুল, বিস্কুট, চিঁড়া, মুড়ি, রুটি নিয়ে হাজির হয়েছেন আল্লাহর পথে আগুয়ান মেহমানদের সেবায়। এদের মধ্যে অবশ্য কোনো শহুরে তথাকথিত এলিটকে দেখা যায়নি।

বিশাল সব অট্টালিকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে সেসব এলিট উদ্বেগে অস্থির হয়ে উঠেছেন। এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের জন্য তারা একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। তারা তো জেনে এসেছেন রাজধানী কেবল তাদের আরাম-আয়েশের জন্য নির্মিত এক সাংঘাতিক সুরক্ষিত এলাকা। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী রয়েছে কেবল এসব বিত্তবানের নিরাপত্তা বিধানের জন্য। সেই রাজধানীতে মফস্বল থেকে দশ লক্ষাধিক কৃষক-শ্রমিকের সন্তানসহ মেহনতি মানুষের কাফেলা এলিটদের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। তাদের জন্য আরও দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে কাফেলার মুসাফিরদের প্রতি রাজধানীর মেহনতি মানুষের ভালোবাসা আর আবেগের অভাবনীয় বহিঃপ্রকাশ। টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি এদেরই একজন, যিনি কি-না পানি বিক্রি করে সংসার চালান, সেই দরিদ্র মানুষটি বিনা পয়সায় মুসাফিরদের পানি খাওয়াচ্ছেন। বিস্মিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, কারবালার প্রান্তরে আমার নবীর বংশধররা পানি পাননি, আজ আলেমদের পানি দিয়ে সেই কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করছি। আল্লাহর কাছে গিয়ে বলতে তো পারব, হে পরওয়ারদেগার আমার এটুকুই ক্ষমতা ছিল।

সংবাদপত্রে এসব কাহিনী পড়ে গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে, চোখের পানি আটকানো যায় না। ফরিদপুর থেকে লংমার্চে আসা একজন আলেম সন্ধ্যায় ফিরে যাওয়ার পথে অনেক কষ্ট করে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। সঙ্গে থাকা বস্তাভর্তি বিভিন্ন ধরনের খাদ্য দেখিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন, সোবহানআল্লাহ, কোথা থেকে যে এত খাবার এসেছে, যেন মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআন শরীফে বর্ণিত ‘মান্না ও সালওয়া’ দান করেছেন তাঁর অকৃপণ, দয়ালু হাতে। মধ্যবয়সী সেই আলেম খাবারের বস্তা থেকে আমাকে তবারকস্বরূপ প্লাস্টিকের এক বাক্সভর্তি তেহারি দিয়ে গেলেন। সে সময় অফিসঘরে আমার এক বাল্যবন্ধু, কয়েকজন সহকর্মী এবং অন্যান্য পেশাজীবী উপস্থিত ছিলেন। আমাকে বিরিয়ানির বাক্স উপহার দেয়ার দৃশ্যে নিজেকে সামলাতে না পেরে এদেরই একজন চশমা খুলে চোখ মুছলেন।

প্রকৃত গণজাগরণের চিত্র বিশ্বের সর্বত্র এরকমই হয়ে থাকে। অথচ শাহবাগিদের সমর্থনকারী মিডিয়া এখন হন্যে হয়ে এই অফুরান খাবার সরবরাহকারীদের পরিচয় খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
একটি জাতীয় দৈনিকে কোন শহর থেকে কত বাস আসবে, সেই সব বাসের ভাড়া কত লাগবে এবং সেই অর্থের জোগানদাতা কারা, ইত্যাদি সম্পর্কে আগাম রিপোর্ট করেছে। ভাবখানা এমন আমাদের আলেম-ওলামারা এতই দরিদ্র যে তাদের ঢাকা-চট্টগ্রাম বাস ভাড়া দেয়ারও সামর্থ্য নেই! এইসব রিপোর্ট থেকে পত্রিকাগুলোর শ্রেণী-চরিত্র বুঝতে আর কোনো সমস্যা থাকে না। সরকার শত শত মানুষ হত্যা করলে এরা কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার প্রয়োজন বোধ না করলেও গাছের প্রাণের জন্য আহজারি শুরু করে দেয়। অপর এক শাহবাগ সমর্থক পত্রিকায় মহাসমাবেশের আগের দিন পর্যন্ত হেফাজতে ইসলামকে বিএনপি-জামায়াতের বি-টিম আখ্যা দিয়ে গালমন্দ করেছে। একই পত্রিকায় এখন বলা হচ্ছে, বিএনপি-জামায়াতের চাপ উপেক্ষা করে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা সাপেক্ষে হেফাজত নেতারা নাকি তাদের লংমার্চ একদিনেই শেষ করেছেন। এই স্ববিরোধী সাংবাদিকতার হোতাদের চেহারা চিনে রাখা দরকার।

এরা তো সেই শ্রেণীর ব্যক্তি, যাদের সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআন শরীফের সূরা আল-ইমরানের ১২০ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “তোমাদের যদি কোনো মঙ্গল হয়, তাহলে তাদের খারাপ লাগে। আর তোমাদের যদি অমঙ্গল হয়, তাহলে তাতে তারা আনন্দিত হয়। আর যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে তাদের প্রতারণায় তোমাদের কোনোই ক্ষতি হবে না। নিশ্চয়ই তারা যা কিছু করে, সে সমস্তই আল্লাহর আয়ত্তে রয়েছে।” এসব মিডিয়ার মালিকরাই শাহবাগে নবী (সা.)-এর কুত্সা রটনাকারীদের ভোগের জন্য দিনের পর দিন অর্থ এবং খাদ্য পাঠিয়ে ধন্য হয়েছে। তাদের প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত কোনো সাংবাদিক তখন এসব বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি অথবা সম্পাদক সাহেবও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার জন্য কাউকে এসাইনমেন্ট দেননি। এদের কাছ থেকে এই আচরণই যেহেতু প্রত্যাশিত ছিল, কাজেই বিশ্বাসীদের হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সূরা আল-ইমরানেরই ১৩৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন, ‘আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও, তবে তোমরাই জয়ী হবে।’ শেষ কথা হলো, ভাড়াটে রাজনৈতিক কর্মী এবং আল্লাহর রাহে জানমাল ত্যাগ করতে উন্মুখ মুমিনের পার্থক্য নিরূপণ করা সেক্যুলারিজমের ধ্বজাধারীদের পক্ষে সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের গণমানুষ কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব অথবা দিকনির্দেশনা ছাড়া যে অভাবনীয় বিপ্লবের সূচনা করেছে, তার ব্যাপ্তি ও স্বতঃস্ফূর্ততার উদাহরণ ছিল ৬ তারিখের হেফাজতে ইসলামের অবিস্মরণীয় লংমার্চ। ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার এবং এদেশে বিদেশি সংস্কৃতির দালালগোষ্ঠী এই গণবিস্ফোরণে দৃশ্যতই বিচলিত ও আতঙ্কিত হয়েছে। হাজার বছরের চেতনার যে মহাজাগরণ আমরা অবাক হয়ে প্রত্যক্ষ করছি, তার মাধ্যমে এদেশের ৯০ শতাংশ মানুষের ঈমান রক্ষার পাশাপাশি আমাদের মাতৃভূমির স্বাধীনতাও নতুন করে সংহত হয়েছে। ইসলামি চেতনা ছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না, ইসলাম ত্যাগ করলে এদেশ স্বাধীনও থাকবে না। বাংলাদেশের অধিকাংশ নাগরিক ইসলাম ধর্মাবলম্বী না হলে এই রাষ্ট্রটির স্বাধীন অস্তিত্বের ভিত্তিই যে তৈরি হতো না, এই চরম সত্য যারা ৪২ বছর ধরে অস্বীকারের চেষ্টা করে চলেছেন, তারা শুধু চরম ইসলামবিদ্বেষীই নন, একইসঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতারও শত্রু।

১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভারতের সর্বশেষ প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলমান অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গ বিপুলভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে ভোট প্রদান করেছিল। সেই নির্বাচনে আইনসভার সবক’টি আসনে এবং প্রাদেশিক আইনসভার ১১৯টি আসনের মধ্যে ১১৩টিতে মুসলিম লীগ জয়লাভ করে। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অন্য কোনো প্রদেশেই মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার পক্ষে এমন নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট প্রদান করা হয়নি। পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠীর সেদিনকার এই সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু ধর্মই নয়, তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে কাজ করেছিল।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শঠতাপূর্ণ বিজয়কে এ অঞ্চলের হিন্দু জনগণের উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলমান শাসকদের কাছ থেকে নিষ্কৃতি বিবেচনা করে স্বাগত জানিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী একশ’ বছর ধরে মুসলমানরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একের পর এক বিদ্রোহ করে গেলেও হিন্দু জনগোষ্ঠী ইংরেজদের সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। শতকব্যাপী সেই বিদ্রোহে এই অঞ্চলের আলেম-ওলামারা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সাহস, দেশপ্রেম ও ঈমানি শক্তির এক অনন্যসাধারণ আদর্শ স্থাপন করে গেছেন। উইলিয়াম হান্টার তার বিখ্যাত ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমান’ বইতে সেই মুসলিম বিদ্রোহের পটভূমি চমত্কারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বইটি লেখার আগে তিনি এসব বিদ্রোহ, বিশেষ করে উত্তর পশ্চিম সীমান্তের যুদ্ধে দু’হাজার মাইল দূরবর্তী অঞ্চলের বাঙালি মুসলমানের অংশগ্রহণ নিয়ে বিশদভাবে অনুসন্ধান করেছিলেন। হান্টার বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছেন, ব্রিটিশরা এদেশে আসার আগে দীর্ঘকাল মুসলমানরা বাংলা শাসন করেছে। মুসলিমশাসিত সমৃদ্ধিশালী বাংলা ব্রিটিশ দখলের পর চরম দারিদ্র্যে পতিত হয়। ব্রিটিশরা মুসলমানদের জমিজমা হিন্দুদের প্রদান করে। মুসলমানদের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করার ফলে বিশাল জনগোষ্ঠী অশিক্ষার অন্ধকারে নিপতিত হয়। সিভিল সার্ভিস এবং সেনাবাহিনীর দরজা তাদের জন্য একেবারেই বন্ধ করে দেয়া হয়। সুতরাং ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।
হান্টারের তদন্তের ফলে ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশের দীর্ঘদিনের সমস্যা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বোঝার চেষ্টা করে। তারা অনেকটা হঠাত্ করেই যেন উপলব্ধি করে যে হিন্দুরা নয়, মুসলমানরাই বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই বাস্তবতা আমলে নিয়েই লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালের ৫ জুলাই ঢাকাকে রাজধানী করে ‘পূর্ব বাঙলা ও আসাম’ প্রদেশ গঠন করেন। প্রায় পৌনে দু’শ বছর পর ঢাকা আবার রাজধানীর মর্যাদা ফিরে পায়। কলকাতার বর্ণহিন্দুরা লর্ড কার্জনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুললে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয় এবং মুসলমানরা ন্যায্য কারণেই ইংরেজ ও হিন্দু উভয় গোষ্ঠীর ওপর বিক্ষুব্ধ হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবেও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ পশ্চিমবঙ্গের অভিজাত হিন্দু শ্রেণী একইভাবে বিরোধিতা করলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মানসিক বিচ্ছেদ চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে।
দুর্ভাগ্যবশত ঢাকার একশ্রেণীর হিন্দু নেতৃবৃন্দ তথাকথিত ওপার বাংলার একই সম্প্রদায়ভুক্তদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে থাকেন, পূর্ববাংলার মুসলমানরা অধিকাংশই কৃষক হওয়ায় তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চ শিক্ষাকেন্দ্রের কোনো প্রয়োজন নেই। প্রকৃতপক্ষে এই স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পূর্ববাংলাকে কেবল কাঁচামাল তৈরির লক্ষ্যে Hinter land হিসেবে রেখে দিয়ে চিরস্থায়ীভাবে শোষণের আকাঙ্ক্ষা মনে মনে পোষণ করতেন। সে সময় পূর্ববাংলার জমিদারদের অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন এবং তারা প্রধানত কলকাতায় বসবাস করতেন। এ অঞ্চলের দরিদ্র মুসলমান কৃষকদের দায়িত্ব ছিল ফসল ফলিয়ে ওইসব অনাবাসী জমিদারদের জন্য সম্পদ তৈরি করা। এই অমানবিক শোষণ থেকে মুক্তিলাভের লক্ষ্যেই ১৯৪৬ সালে পূর্ববাংলার মুসলমানরা মুসলিম লীগকে এভাবে সমর্থন করেছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর তারা যখন দেখলো, ভাগ্যের পরিবর্তন না হয়ে কেবল শোষক পরিবর্তন হয়েছে, তখন আবারও বিদ্রোহের ঝাণ্ডা তুলে ধরতে সংগ্রামী মানুষগুলো বিলম্ব করেনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ তাই পশ্চিম পাকিস্তানি জালিম শাসকের বিরুদ্ধে মজলুমের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৪২ বছর ধরে বাংলাদেশের একশ্রেণীর রাজনীতিক সেই মুক্তিসংগ্রামকে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রূপ দেয়ার অব্যাহত অপচেষ্টা করে চলেছে। অভিন্ন বাঙালি সংস্কৃতির নামে পশ্চিমবঙ্গের ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি আমদানি করে তারা আমাদের নিজস্ব জাতিসত্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত করেছে। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির দীর্ঘকাল বাদে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে যে অভূতপূর্ব গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, তারই প্রকাশ ঘটেছিল এ মাসের ৬ তারিখে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে। তবে স্মরণে রাখা দরকার, সরকারের সব বাধা চুরমার করে সেই বিপ্লবের প্রাথমিক বিজয় কেবল আমরা অর্জন করতে পেরেছি। বিপ্লবকে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, অনেক ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন পড়বে। প্রতিবিপ্লবী গোষ্ঠী এরই মধ্যে তত্পর হয়ে উঠেছে। মার্কিন-ভারতের চিহ্নিত দালাল, ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়া ৬ তারিখের অর্জনকে খাটো করার জন্য নানারকম বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় লিপ্ত হয়েছে। পলাশী যুদ্ধের পর যেমন করে ব্রিটিশ এবং হিন্দুরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, আজও একইভাবে ইসলাম ফোবিয়ায় আক্রান্ত পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো এবং ভারত এক হয়েছে। কাজেই সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের মোর্চার বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে।
সরকারের ইন্ধনে শাহবাগিরা ইতোমধ্যে নববর্ষের দিনে পাল্টা মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে। শাহবাগিদের মহাসমাবেশ ডাকার দিনগুলো নির্বাচনের কৌশল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এর আগে ২১ ফেব্রুয়ারি এবং ২৬ মার্চ তারা একই কাণ্ড করেছে। অর্থাত্ শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস এবং নববর্ষের মতো জাতীয় দিবসগুলোকেও বিদেশিদের সমর্থনপুষ্ট এই প্রতিবিপ্লবী গোষ্ঠী ন্যক্কারজনকভাবে দলীয়করণের অপচেষ্টা করছে। নববর্ষের দিনে রমনা পার্ক এলাকায় সারাদিন ধরে এমনিতেই রাজধানীর কয়েক লাখ অধিবাসীর সমাগম ঘটে। এই সুযোগ গ্রহণ করেই শাহবাগিরা দেখাতে চাচ্ছে যে, তাদের পেছনেও লাখ লাখ মানুষের সমর্থন রয়েছে। তাদের এই ভুয়া মহাসমাবেশের মুখোশ এখনই উন্মোচিত করে দেয়া অত্যন্ত জরুরি। উল্লেখ্য, শাহবাগের তথাকথিত আন্দোলনের সূচনাই হয়েছিল একুশে বইমেলার জনসমাগমকে কেন্দ্র করে। পরবর্তীতে মিডিয়া সার্কাস, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে ব্যবসায়ীদের বেশুমার অর্থ ও খাদ্যদ্রব্য প্রেরণ, জমায়েতগুলোতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সরাসরি অংশগ্রহণ, প্রশাসনের নিরাপত্তা প্রদান ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদির মাধ্যমে কথিত গণজাগরণের বেলুনকে যথাসাধ্য ফুলিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
শাহবাগ পিকনিকের প্রথম দিকে শহুরে মধ্যবিত্তের বিনোদন তৃষ্ণার কারণে তাদের মধ্যে খানিকটা উত্সাহের সৃষ্টি হলেও এখন সব বিভ্রান্তির অবসান হয়েছে। ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের পৃষ্ঠপোষক এবং সরকারি নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে সম্যক অবহিত থাকার কারণেই জাতীয় দিবস ছাড়া অন্য দিনে মহাসমাবেশ ডাকার মতো মনোবল তাদের আর অবশিষ্ট নেই।
কিছুদিন আগে শাহবাগ চত্বরের একেবারে কাছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৪ দলের মহাসমাবেশে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দিয়ে এসেছেন। সেদিন জনসমাগম দৃষ্টিকটুভাবে কম হওয়ায় উপায়ান্তর না পেয়ে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বিরোধী দলের হরতালকে সেজন্য দায়ী করেছিলেন। অথচ সরকারি হরতাল এবং সর্বাত্মক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ঢাকাকে দেশের অন্যান্য স্থান থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া সত্ত্বেও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্ সমাবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই এ ধরনের সমাবেশ আয়োজন করা অতীতেও সম্ভব হয়নি, ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা দেখি না।
শাপলা চত্বরের সমাবেশে লক্ষ লক্ষ কাতারবন্দী অংশগ্রহণকারী যে সুশৃঙ্খলভাবে সভা শুরু, পরিচালনা এবং শেষ করেছেন সেটাও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য শিক্ষণীয় হওয়া উচিত। মহাসমাবেশের বিশালত্ব সব বিদেশি মিডিয়াকেও বিস্মিত করেছে। আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং কট্টর ইসলামবিদ্বেষী বিবিসি বাংলা’র সংবাদে বলা হয়েছে, “দুপুরের পর থেকে শাপলা চত্বর ঘিরে পুরো এলাকাটি এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে বায়তুল মোকাররম পর্যন্ত রাস্তাটি ছিল মানুষের ভিড়ে ঠাসা। মতিঝিল ঘিরে আশপাশের রাস্তাগুলোতেও ছিল মানুষের স্রোত।” শাহবাগিদের প্রতি একটি ক্ষুদ্র প্রস্তাব রেখে আজকের লেখা শেষ করব।
শাহবাগি গোষ্ঠী, সরকার এবং বাংলাদেশের ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়া সেই ৫ ফেব্রুয়ারি থেকেই কথিত প্রজন্ম চত্বরের জমায়েতকে গণজাগরণ বলে দাবি করে চলেছেন। হেফাজতে ইসলামের ডাকে ৬ তারিখে শাপলা চত্বরে ঢাকাবাসী ইসলামি চেতনায় গণবিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করেছে। এখন বাঙালি চেতনার ধ্বজাধারীরা সেই একই শাপলা চত্বরে অপর একটি মহাসমাবেশের আয়োজন করলে এবং সেদিন ঢাকাকে প্রশাসনিক নির্দেশে বিচ্ছিন্ন করা হলে এদেশে কোন চেতনার পক্ষে স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থন বেশি, সেই বিতর্কের একটা মীমাংসা হয়তো হয়ে যেতে পারে। আশা করি, বাঙালি চেতনাধারীদের মধ্যে শেখ হাসিনার চেয়েও নিজেদের অধিক জনপ্রিয় বিবেচনাকারী শাহরিয়ার কবির, ব্লগার ইমরান গং এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবেন।
পুনশ্চ : আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ গতকাল এক সমাবেশে আমার দেশ পত্রিকা অফিসে ৮৫ কোটি টাকা ভাগাভাগি এবং সেখান থেকে আমার ৪ কোটি টাকা নেয়ার নির্লজ্জ মিথ্যা দাবি করেছেন। এ রাজনীতিকের নাম শেখ হাসিনার এবারের মেয়াদের আগে আমি কোনোদিন শুনিনি। আমার সম্পর্কে কুষ্টিয়া থেকে আমদানি হওয়া লোকটির কোনো ধারণা আছে কিনা, তাও বলতে পারব না। আপাদমস্তক দুর্নীতিবাজ সরকারের এই মুখপাত্রের মিথ্যাচারে আমি অবশ্য একেবারেই অবাক হইনি। একজন চোর যে সচরাচর সাধুসন্তকেও চোরই ভাবে—সেই গল্প স্কুলজীবনেই পড়েছি। পাঠককে কেবল জানিয়ে রাখছি, এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত সন্ধ্যায় আমার আইনজীবীর সঙ্গে শলা-পরামর্শ করেছি। আশা করি, আগামীকালের মধ্যেই প্রাথমিক পদক্ষেপ নেয়া হবে।
- মাহমুদুর রহমান

আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘প্রশাসনের কাজ সহজ করার জন্য ঢাকা সিটি কর্পোরেশন দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। উনারা যেভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন তাতে মনে হয় ঢাকা ভেঙে দু’টুকরো হয়ে গেছে। কই কোথাও কোনো ফাটল তো দেখা যাচ্ছে না।’’
‘উনারা’ মানে বিরোধীরা রাজনৈতিক দলটি প্রচারণা চালাতেই পারে রাজনৈতিক কিংবা জাতীয় ইস্যু নিয়ে। সরকারে থাকা দলও চাইলে পারে। ক্ষমতার রাজনীতিতে এমন প্রচারণা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বটে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর রসবোধ বেশ।  সত্যিই আমাদের পায়ের নীচের ঢাকার ভূ-উপরিভাগে কোনো ফাটল তো আমরাও টের পাচ্ছি না!  কিংবা এই বিভক্তির ফলে ঢাকার অনেক শত বছরের ঐতিহ্যের কিছু হেরফের হবে বলে অনেকে যা বলছেন, তার সঙ্গে একমত হবার কোনো কারণও আমি দেখছি না।
বিমূর্তভাবে যে ‘ঢাকার শহর’-এর কথা বলা হয়, সে শহরের ভূমিতে ফাটল নিশ্চয় ধরানো হয়নি আইন করে।  বরং ঢাকায় বিদ্যমান ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) এর বদলে দুটি করপোরেশন করা হচ্ছে।  আর মুশকিলটা এখানেই।
সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে  ‘ঢাকা শহর’ বা ঢাকা সিটি মানে হলো সিটি করপোরেশন আইনে নির্ধারিত একটা এলাকা। এই ‘ঢাকা’ই ছিল সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের রাজধানী।
সংবিধানের ৫ম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের (বাংলাদেশের) রাজধানী ঢাকা। অপরদিকে ব্যাখ্যামূলক অনুচ্ছেদ ১৫২-তে ঢাকা বলতে অন্য কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, বরং রাজধানী বলতে ৫ম অনুচ্ছেদে বর্ণিত ঢাকাকেই বোঝানো হয়েছে।
আগের ঢাকা সিটি করপোরেশন আইনে নির্ধারিত এলাকাই ছিল ‘ঢাকা’ সিটি।  আর এখন আইনটি সংশোধন করে সাবেক ঢাকা সিটির বদলে দুটি সিটি করা হয়েছে। ঢাকা সিটি বলে আইনত কিছু আর নেই। আছে ঢাকা উত্তর সিটি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি। তবে যে বাংলাদেশের রাজধানী রইলো ঢাকায়! সেই ঢাকা কই?
এ এক বিশাল সাংবিধানিক ও আইনগত মুশকিল। প্রধানমন্ত্রীর কথা সরল বিশ্বাসে কবুল করে নিচ্ছি। নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর জন্যই এই দুটি সিটি করা হয়েছে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বাড়তি নাগরিক সুবিধা না হয় হবে আশা করি। কিন্তু এ সাংবিধানিকভাবে এ রাজধানীশূন্যতা কি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অপরিপক্বতা ও আমাদের জাতীয় রাজনীতির অক্ষমতা প্রকাশ করে না?
যে কারণেই হোক, সরকার মনে করেছেন ঢাকা বিলুপ্ত করে দুটি সিটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটা দেশের জন্য কি উপকার বা অপকার বয়ে আনবে সে বিবেচনা আলাদাভাবে করা যেতে পারে। কিন্তু এমন একটা ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সাংবিধানিক ইস্যুটা ভাবা কি জরুরি ছিল না?
এখন হয় উত্তর কিংবা দক্ষিণ ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের বিধান করে সংবিধান সংশোধন করে, নয়তো এ আইনের এ সংশোধন বাতিল করে আবার ঢাকা ফিরিয়ে এনেই কেবল এই মুশকিলের আসান হতে পারে।
অবিভক্ত ঢাকার সর্বশেষ মেয়র সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করেছেন, সাবেক ঢাকা সিটির এলাকায় দুটি সিটি করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে।  ফলে উচ্চ আদালত নিশ্চয় এ বিষয়ে তার বিজ্ঞ মতামত দিতে যাচ্ছেন। তখন হয়তো আরো পরিস্কার হবে সাংবিধানিক এ মুশকিলের বিষয়টি।
খন্দকার এরশাদুল বারী

নরসিংদির জনপ্রিয় তরুণ মেয়র লোকমানকে হত্যা করা হয়েছে তারই সংগঠনের কার্যালয়ে। সে-তো মাস অতিক্রম করতে যাচ্ছে। মেয়র হত্যাকান্ডের পর খুবই স্বাভাবিকভাবে সারাদেশব্যাপী এর প্রতিক্রিয়া হয়েছে ব্যাপক, হচ্ছে এখনও।
এই হত্যাকান্ডের পর বেরিয়ে আসছে রাজনৈতিক দলগুলোর হিংস্রতার উপাখ্যান। একজন তরুণ ছাত্র লোকমান হোসেন তার জনপ্রিয়তা দিয়ে এলাকায় হয়ে উঠেছিলেন অবিসংবাদিত নেতা। বলতে গেলে ঈর্ষা করার মতো নেতা তিনি হতে পেরেছিলেন। তার হত্যার পরই হয়ত দেশবাসী জেনেছে লোকমানের জনপ্রিয়তার কথা। বাংলাদেশের ছাত্র-যুব রাজনীতি যখন টেন্ডার আর চাদাবাজির অন্ধ চোরাগলিতে প্রতিদিন মাথা ঢুকিয়ে গোটা যুবসমাজটাকেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে কলুষিত করছে, ঠিক তখন লোকমান মরে গিয়েই যেন প্রমাণ করে গেলেন বাংলাদেশেরও একজন তরুণ নেতা সত্যিকার অর্থে জনপ্রিয় হতে পারেন। হয়ত এই জনপ্রিয়তাই তাকে পৃথিবীতে থাকতে দিলো না। রাজনৈতিক হিংস্রতা তাকে প্রতিনিয়ত ধাওয়া করেছে। একজন লোকমানকে হত্যা করতে দীর্ঘ পরিকল্পনা করতে হয়েছে। এবং এই পরিকল্পনা অন্তত চলেছে এক বছর থেকে।
লোকমান হত্যার পর বেরিয়ে আসছে নরসিংদীর রাজনীতির অনেক চিত্র। লোকমানের ভাই নরসিংদীর আরেক ছাত্রনেতা শুধু আঙ্গুল তুলে দেখাননি, প্রকাশ্যে বলছেন এই হত্যাকাণ্ডের সাথে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী রাজিউদ্দিন রাজুর সংশ্লিষ্টতার কথা। প্রধান আসামির মাঝে আছেন মন্ত্রীর ভাই এবং তার পিএস।
এরই মধ্যে আটক করা হয়েছে কয়েকজনকে। তাদের বেশিরভাগই নরসিংদির আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মী।  জেরা-ভাষ্যে তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে আওয়ামীলীগের আভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের নোংরামীর কথা, এমনকি মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতার কথা। কি আশ্চর্য... আওয়ামীলীগ বিএনপি‘র বাংলাদেশের রাজনীতির সতীনি-দ্বন্দ্ব এখানে এসে এক অদ্ভুত সন্ধিতে মিলিত হয়েছে। ভোট রাজনীতির মাঠে তাই জয়ী হবার অলীক আশায় দুটো পার্টিই চেয়েছে লোকমানকে সরিয়ে দিতে। তাইতো আটককৃত নেতাকর্মীরাই জানাচ্ছে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা হত্যার জাল বুনেছে আর বিএনপি’র নেতা অর্থ জুগিয়েছে। কী নৃশংস গণতান্ত্রিক (?) চর্চা আমাদের বাংলাদেশে।
২) বর্তমান সরকারের বয়স তিন বছরের কাছাকাছি। এই বয়স সীমায় সরকারের আশার বাণী শুনেছে বাংলাদেশ। আশায় আশায় বাংলাদেশের মানুষ যেন নির্ভরতার ভেলায় ভেসেছে। সরকারের বড় বড় মন্ত্রীরা সে আশা দেখিয়েছেন দেশের মানুষকে। কিন্তু মন্ত্রীদের সেই আশার বাণীগুলো কি কোনও রশ্মি দেখাতে পেরেছে দেশের মানুষকে। কিছু কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু, সংবিধান সংশোধন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া হয়ত রাজনীতিকদের জন্যে কিংবা দলের জন্যে আশার আলো নিয়ে এসেছে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে হানাহানি কিংবা ব্যর্থতার রাজনীতি বন্ধ করতে কি সরকারি ভালো কোন উদ্যেগ পরিলক্ষিত হচ্ছে, এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আর সেজন্যেই মন্ত্রীপরিষদের মন্ত্রীদের ব্যর্থতার কথা উঠে এসেছে মানুষের মুখে মুখে। দীপু মনি বিদেশ সফরের সেঞ্চুরি করলেও পররাষ্ট্রনীতির হিসেবের খাতায় কি যোগ হয়েছে , তা-তো প্রশ্নসাপেক্ষ। এমনকি অত্যন্ত আস্থাভাজন ভারতের কাছ থেকেও যেন ন্যায্য পাওনা পেতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ কোটি-কোটি টাকা ব্যয়ের পর। শুধুমাত্র কূটনৈতিক ব্যর্থতা প্রকারান্তরে পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতার কারণেই।
আসা যেতে পারে সাহারা খাতুনের কথায়। ‘দোষী যে-ই হোক তাকে ছাড় দেয়া হবে না,’ ছাড়া আর কোন গতি আছে কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খাতায়। সোহেল তাজের মন্ত্রিত্বের কি হচ্ছে, তা নিয়ে রহস্যের জট খোলে নি এখনও সরকার। শেয়ার মার্কেটের ধস যতটুকু সরকারকে সমালোচিত করেছে তার চেয়ে বেশী বিতর্কিত করেছে অর্থমন্ত্রীর প্রগলভ কথাবার্তায়।
যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের মন্ত্রণালয় যেন বালির মাঝে মুখ লুকিয়ে উঠ পাখি সেজেছে। মানুষ মরছে প্রতিদিন। রাস্তাঘাট বেহাল। পদ্মাসেতু নিয়েও সেই একই অবস্থা। প্রধানমন্ত্রী বলেন সেতু হবেই। আর বিশ্বব্যাংক বলে সৈয়দ সাহেব থাকলে তারা ছাড় দেবে না। কারণ সৈয়দ সাহেবেরই প্রতিষ্ঠান সাঁকো ইন্টারন্যাশনাল এর আগে বড় ধরনের কমিশন দাবি করেছে সম্ভ্যাব্য ঠিকারদারী প্রতিষ্ঠানের কাছে। এসব কিছুইতো কোনও লুকানো ব্যাপার নয়।
লোকমান হত্যাকান্ড নিয়ে মন্ত্রী রাজুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এই হত্যাকাণ্ডের পর রাজুর এমনকি ব্যক্তিগত নৈতিকতা নিয়েও প্রকাশিত হচ্ছে অনেক কিছু। যা একজন মন্ত্রীকে অবশ্যই জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কিন্ত রাজু প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। এখানে আবার কিসের অবস্থান। একজন মন্ত্রী খুনের সাথে সংশ্লিষ্ট একথা আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু বাতাসে যা রটেছে তা দেশের মানুষ অবিশ্বাসই করবে কীভাবে! দেশের মানুষের বিশ্বাসই হলো একটি রাষ্ট্রের আস্থার জায়গা। এই জায়গাটুকুতে রাজু- আবুল হোসেন-ফারুক খানরা ধাক্কা দিয়েছেন। বলা যায়, এভাবেই অনেক মন্ত্রীর কথা। অথচ আমাদের প্রধানমন্ত্রীও যেন সেই উঠ পাখির মতো। বালিতে মাথা গুঁজে আছেন।
মন্ত্রি বদলালে সরকারের তো কোন ব্যতয় ঘটার কথা নয়। নিকটবর্তী দেশ ভারতেও মাত্র এই তিন বছরে মনমোহন অনেক রদবদল করেছেন। ব্যর্থতা কিংবা অভিযোগের দায় নিয়ে অনেকেই বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু কী এমন এক দায়বদ্ধতা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর যেখান থেকে তিনি নিজে একটুও নড়ছেন না। আমরা জানি প্রধানমন্ত্রীর সরকারেও মতিয়া চৌধুরীর মতো মন্ত্রী আছেন কিংবা আছেন নুরুল ইসলাম নাহিদের মতো শিক্ষামন্ত্রী। যে নাহিদের মুখে একসময় কুদরত-ই খুদা শিক্ষা কমিশনের কথা বার বার উচ্চাতি হতে শুনতাম, সেই নাহিদ আজ ব্যস্ত তার নাহিদ কমিশন নিয়ে। যেন বৈপ্লবিক এক শিক্ষা সংস্কার বাংলাদেশে ইতিহাসে। তাদের বিরুদ্ধে জনগণতো কিছু বলে না। বলে শুধু আওয়ামীলীগেরই কিছু মানুষ।
ব্যারিস্টার শফিক, আব্দুর রাজ্জাক, মতিয়া চৌধুরী, নাহিদ তাদের চোখে এখনও আওয়ামীলিগের মানুষ নন কিংবা নন এরা সরকারের জন্যে আশা জাগানিয়া নেতা। এরা সাধারণ মানুষের কাছে সৎ এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নেতা হিসেবেই পরিচিত। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ডের দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের ব্যাপারে তারা নীরব। নাহিদেরা তাদের কাছে শুধুই ‘কমিউনিস্ট’। যদিও এই উচ্চারিত মানুষগুলো অনেক আগেই কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে সম্পর্ক ছেদ করেছেন। এবং সত্যিকার অর্থে কি, এদের দিয়ে কমিউনিস্টদের বিপ্লব (যদিও স্বপ্ন) চোরাগলিতেই পথ দেখবে। তবে হ্যাঁ, একসময়ের কমিউনিস্ট হবার কারণে হোক কিংবা ব্যক্তিগত কারণেই হোক, এরা সৎ রাজনীতিবিদদের  কাতারে পড়ে গেলে এটাতো আওয়ামীলীগের জন্যেই একটা প্লাস পয়েন্ট। অথচ যেহেতু এরা দুর্নীতির সাথে জড়িত নেই,অতএব এরা এখন কমিউনিস্ট এবং আওয়ামীলীগ থেকে "খেদাও কমিউনিস্ট" গোষ্ঠির উদ্ভব।
বর্তমান সরকারের বোঝা হলো কতিপয় মন্ত্রী। দীর্ঘ তিন বছরের মাথায় এসেও এদের দুর্নাম কমে নি বরং বেড়েছে। কিছু মন্ত্রীর সার্থকতা শূন্যের কোঠায়। সার্থকতা-ব্যর্থতা দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ এমনকি ঐ সার্থকতা-ব্যর্থতা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে দেশের জনগণ বিভিন্নভাবে। আমরা বিশ্বাস করি, শেখ হাসিনা ভালোভাবেই জানেন কার কি দায়, কোথায় কার দুর্বলতা কিংবা ব্যর্থতা। প্রধানমন্ত্রীর হাতেই এখন বিচারের ভার। কারণ শুধু তিনিই পারেন মন্ত্রীপরিষদসহ বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন আনতে। বদলে দেবার অঙ্গীকার নিয়ে আজকের প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসেছিলেন। জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন দু‘তিন বছরে হবার নয়, আমরা তা মনেও করি না। কিন্তু জনগণ পরিবর্তনের ধারা দেখতে চায়, তাতো বিবেচনায় নিতে হবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী কিংবা তার বিশ্বস্ত মানুষদের।

ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের মধ্যে একটু আহামরি ভাব তৈরি হয়েছে। কারো কারো ভাবখানা এমন যে পৃথিবীতে বাংলাদেশই বুঝি এই ব্যবস্থা প্রথম চালু করছে। কেউ কেউতো পকেটে ডিজিটাল  ফোন নিয়েই ভাবছে:
‘ডিজিটাল বাংলা এখন আমার পকেটে,
মুড়ির টিনটা ছুড়ে ফেলে চড়বো এবার রকেটে।’
পাঠক, যাদের বয়স ত্রিশের উপরে তাদের গাজীপুর টু গুলিস্তান কিংবা এয়ারপোর্ট টু কালাচাঁদপুরের সেই ঢাউস সাইজের কচ্ছপ গতির মুড়ির টিন বলে খ্যাত বাসগুলোর কথা মনে থাকার কথা। ঢাকার বুকে অতিকায় ডাইনোসরের মতো বিশাল আকৃতির এই বাসগুলোর বিলুপ্তি ঘটলেও এখনো এগুলো দেশের আনাচে কানাচে দাবড়ে বেড়াচ্ছে।
যা বলছিলাম, মুড়ির টিন ছুড়ে মেরে ঐ বাসের যাত্রীদের কপালে রকেট তো দূরের কথা এসি গাড়িও  জোটেনি। সিটিং বাসের চিটিং সার্ভিসে চড়ে এখন অফিস টু সাব লেটে যাতায়াত (পুনশ্চ: চিটিং সার্ভিস বলার অর্থ হচ্ছে, ভাগ্য অতি সুপ্রসন্ন না হলে সিটিং সার্ভিসে উপরের রড ধরে মানবের পূর্ব পুরুষের স্টাইলে ঝুলে থাকা ছাড়া উপায় নেই। সাব লেটের মানে হচ্ছে ঢাকা শহরে গরীব ভদ্রলোকদের সাবলেটে থাকা ছাড়া কোন্ও গতি নেই। বাজার করতেই মাস শেষ, বাসা ভাড়া দেবে কি করে)।
ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে কি শুধু ঘরে ঘরে কম্পিউটার দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে কম্পিউটার অপারেটর তৈরি করা! নাকি সারা বাংলায় ফোনের এনালগ কানেকশনের পরিবর্তে ডিজিটাল কানেকশন সংযুক্ত করে দেওয়া! আমাকে নির্বোধ ভাবলে করার কিছু নেই। এটা আমার কথা নয়। অনেকের ভাবনার কথা শুধু আঙুল নেড়ে টাইপ করে দিলাম। ডিজিটাল পন্ডিতেরা বলেন, এটা হচ্ছে টেকনোলজির আধুনিক এবং ফলপ্রসূ ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো সেবাখাত থেকে সহজে জনগণকে সর্বোত্তম সেবা পৌঁছে দেওয়া।
এটা গেল ডিজিটাল বাংলার কাজের ধরন কি হবে সেই কথা। কিন্তু এর দর্শন? এটা বোঝা আরো দুরূহ। এর মাধ্যমে নাকি জনগণের মুক্তি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা, সুশাসন কায়েম ইত্যাকার রসমালাইয়ের মতো ভাল ভাল রাসালো (যাহা কিছু ভাল তাহাইতো রসালো) বস্তু উপহার দেওয়া হবে। গরীবেরা রস মালাইয়ের রস চেখে না দেখতে পারলেও এর স্বাদটা অন্তত: বলতে পারে কেমন। কিন্তু ডিজিটাল বাংলার দর্শনের রস বোঝা বাঙালির পক্ষে কল্পনা ছাড়া আর কি হতে পারে! যেখানে প্রতিনিয়ত কাদের, লিমনের মতো তরতাজা যুবকেরা দুঃশাসনের বিষে আক্রান্ত সেখানে সুশাসনের রস চেখে দেখার সময় কোথায়?
আর স্বচ্ছতা? কাদের কি চোখে ম্যাগনিফাইং গ্লাস লাগিয়েও বুঝতে পেরেছিল যে মাতাল পুলিশ অফিসার কেন তাকে চাপাতি দিয়ে কোপালো! জবাবদিহিতার কথা আর কি বলবো! এটাতো জনগণকে প্রতিনিয়ত দিয়ে যেতে হচ্ছে। যেমন: রাতে কাজে কিংবা বোনের বাসায় স্বাধীন দেশে বের হলেও প্রশ্ন: ‘এতো রাতে  কেন তুই বের হয়েছিস? কি মতলব?’ পকেটে হাত দিয়ে কিছু দিয়ে দিলেইতো সব চুকে যায়… এই সহজ কথাটাই বুঝতে না পারায় যেতে হয় লাল দালানে, খেতে হয় চাপাতির কোপ।
এভাবেই ডিজিটাল নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অবিমিশ্র ধারণা বিরাজ করছে সমাজে। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা কি সেটা তারা নিজেরা জানলেও জনসচেতনতা তেমন তৈরি করতে পারেন নি। তাই সরকারের চিন্তা ডিজিটাল পর্যায়ে উন্নীত করা গেলেও জনগণ এখনো এনালগ জীবনে পড়ে আছে।
এবার ডিজিটাল ফ্যান্টাসির জগতটা একটু ঘুরে আসি। বিদেশে ডিজিটাল কাঠামোর সেবাটা কি রকম  সেটা দেখুন। আপনি হয়তো কোন সেবা সেক্টরে ফোন করেছেন কোন্ও সমস্যা সমাধানের জন্য।
গ্রাহকের করা ফোনের রিং বাজছে: ক্রিং ক্রিং ক্রিং
প্রথমেই রেকর্ডকৃত অপারেটরের গলা শুনতে পাবেন, ‘শুভ সকাল। আপনাকে ডিপার্টমেন্ট অব ওয়েলফেয়ারের পক্ষ থেকে স্বাগতম। কাস্টমারদের গুণগত সেবা প্রদানের জন্য আপনার কলটা রেকর্ডিং হতে পারে। আপনার আপত্তি থাকলে দয়া করে সেটা অপারেটরকে জানাবেন। আপনি যদি ঢ কারণে  ফোন করে থাকেন তাহলে দয়া করে ১ চাপুন, ণ এর জন্য হলে ২ এবং ত এর জন্য হলে ৩ চাপুন।’
এরপর কাস্টমার প্রয়োজন অনুযায়ী ফোনের বাটন টিপলেন। আবারো রেকর্ডকৃত কন্ঠস্বর- ‘ধন্যবাদ আমাদেরকে কল করার জন্য। এই মুহুর্তে আমাদের সকল অপারেটর কাস্টমার সার্ভিস নিয়ে ব্যস্ত আছেন। অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন’। এরপর একপর্যায়ে কেউ একজন কাস্টমারটির সমস্যা শুনলেন ও সমাধানের চেষ্টা করলেন।
এভাবেই এগিয়ে প্রক্রিয়া। আপনি সিংহভাগ সমস্যাই বাসায় বসে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে করতে পারেন। এতে আপনার সময় বাঁচলো, গাড়ির পেট্রোল খরচ কম হলো, পরিবেশ দূষণ কমলো, রাস্তার জ্যাম নিরসনেও সহায়ক হলো।
বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা গড়ার প্রথম সমস্যা হলো, আমাদের সবার ঘরে ঘরে ল্যান্ড ফোন নেই। ল্যান্ড ফোন নেবার জন্য যে টাকা এবং যতোদিন ধরে আপনাকে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে তার চেয়ে না নেওয়াটাই ভাল। মোবাইল ফোনে কথা বললে সময় সাপেক্ষ বিধায় বিল বেশি আসতে পারে। রাস্তায় পাবলিক ফোন দিলেতো সেরেছে! পরেরদিনই জায়গার মাল জায়গায় না খুঁজে কটকটির দোকানদারের ঝোলার মধ্যে খুঁজলে পেয়ে যাবেন।
ডিজিটাল বাংলা গড়তে হলে মানুষের কম্পিউটারের উপর যেভাবে হোক নির্ভর করতে হবে। সেটা নিজে কিনে হোক কিংবা সরকারি ব্যবস্থাপনায় হোক। কিন্তু আমাদের দেশে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কয়জনের ঘরে কম্পিউটার আছে সেটাই বিষয়। উন্নত দেশে সবাই যাতে এই সেবা পেতে পারে সে জন্য প্রতিটা কমিউনিটিতে কমিউনিটি লাইবে্িররর ব্যবস্থা আছে যেখানে আপনি বই পুস্তক, ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে বাচ্চাদের খেলনা যেমন ধার নিতে পারবেন ঠিক তেমনি ওখানে বসে ইন্টারনেট, কম্পিউটারের সুযোগ পাবেন ফ্রি। কোন্ও টাকা পয়সা তো লাগবেই না বরং উল্টো ওখানকার কর্মচারীদের মিষ্টি ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে বাসায় ফিরবেন। আমাদের দেশে এটা হলে ঘটতো উল্টোটা। দেখা যেত এলাকার কোন্ও প্রভাবশালী লোক কিংবা মাস্তান লাইব্রেরির বড় সাহেবকে ম্যানেজ করে ভাগে জোগে ওখানে স্বল্প খরচে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কোর্স চালুর পাশাপাশি কম্পিউটার কম্পোজের ব্যবসা খুলে বসেছে। কিছুদিন পরে কম্পিউটারের এটা ওটা বেচা শুরু করে শেষমেষ পুরো মুরগীটাই রোস্ট করে খেয়ে ফেলবে।
সত্যিকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে পারলে গণ মানুষের হয়রানি যে বন্ধ করা যেত সেটা আন্দাজ না করলেও চলে। যেমন এর মাধ্যমে ঘুষটাকে বন্ধ করা যেত পুরোপুরি। ঘুষের ব্যপারটা সাধারণতঃ তখনই ঘটে যখন ঘুষ দাতা এবং ঘুষ গ্রহীতার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ঘটে। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশ তো  ‘ভাল আছি ভাল থাকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখোর’ মতো। যে চিঠিতে ডাক পিয়নের কোন কারবার নেই। চিঠি বিলি শেষে টাকা চাইবে কে! অঘটনঘটন পটিয়সী বিদ্যায় পারদর্শী বাঙালী হয়তো এরও একটা বিকল্প ব্যবস্থা বানিয়ে ফেলবে। কেমন হতে পারে সেটা?
গ্রাহক: ক্রিং ক্রিং ক্রিং
অপারেটরের রেকর্ডকৃত কন্ঠস্বর, ‘দু:খিত, আপনার কলটা এই মুহুর্তে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। আপনি দয়া করে ঢ ব্যাংকের ঢ অ্যাকাউন্টে ঢ পরিমাণ টাকা পাঠিয়ে কথা বলার টোকেন নাম্বার সংগ্রহ করুন। নাম্বারটা মনে রাখুন এবং পুনরায় আবার ফোন করুন। ধন্যবাদ’
দেরী না করে গ্রাহক অন লাইন ব্যাংকিং এ ডিজিটাল ঘুষের কিছুটা পরিশোধ করে বাকীটা কাজ সারার পরে দেবার মনস্থ করে আবারো ফোন দিলেন।
গ্রাহক: ক্রিং ক্রিং ক্রিং
রেকর্ডকৃত অপারেটর: দয়া করে আপনার টোকেন নাম্বারটা বলুন।
গ্রাহক: ঢ ঢ ঢ ঢ ঢ ঢ ঢ
রেকর্ডকৃত অপারেটর: দু;খিত আপনাকে সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না। পুরো টাকা পরিশোধ না করে বিশ্বাস ভংগের অপরাধে আপনার নির্ধারিত কাজটি তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হোল। এর মধ্যে পুরো টাকা পরিশোধ করে নতুন টোকেন নাম্বার সংগ্রহ করে পুনরায় ফোন করুন। বাই।
আরেকটা গুরুতর সমস্যা আছে। অন লাইন সেবায় তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের দেশে আতœীয় সম্পর্কগুলো এমন যে নাম, বাবার নাম এবং ঠিকানা জানা থাকলে তার চৌদ্দ গুষ্টির পরিচয় জানা মুহুর্তের ব্যাপার। যদিও এই সমস্যাটা কাটিয়ে উঠতে পারলে স্বজনপ্রীতি পুরোপুরি ঠেকানো যেতো। এবার শুনুন, অন লাইন সেবার বাংলা সংস্করণে কি ঘটতে পারে-
অপারেটর: নাম বলুন
গ্রাহক: কালা মিঞা
অপারেটর: পিতা?
গ্রাহক: মোকসেদ
অপারেটর: ঠিকানা বলুন?
গ্রাহক: ২৪ মরনের পাড়, থানা: ধোলাই খাল
অপারেটর: আরে, আমাগো কালা ভাই নাকি!
গ্রাহক: তুমি কেডা বাপু?
অপারেটর: আমি মজনু, টোকেন পাড়ার মজনু।
এরপরে কি ঘটবে বুঝতেই পারছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা খাজুরে আলাপ চলতে থাকবে। অফিসতো নয় যেন অন লাইন আড্ডা! ওদিকে অন্য গ্রাহকেরা বারবার ফোন করেও সেই ভাঙা রেকর্ড শুনতে পাবে,
‘এই মুহুর্তে আমাদের সকল অপারেটর কাস্টমার সেবায় ব্যস্ত আছেন। আপনার কল অপেক্ষায় আছে। ধৈর্য ধরে লাইনে থাকুন’।
ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যাবে। অপেক্ষার পালা শেষ হবে না। বোঝ এবার ডিজিটাল ভোগান্তি কারে কয়!
এবার আসা যাক জরুরি সেবা সেক্টরে এর কি ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যেমন অনেক স্থানে জরুরি সেবা গ্রহণের জন্য দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ এবং ফায়ার ব্রিগেডের জন্য খুব সহজ একটা নাম্বার থাকে যেন খুব দ্রুত ফোন করা যায়। বাঙলাদেশেও মনে করি হয়ে গেল সে রকম একটা কিছু। যেহেতু ডিজিটাল যুগে মানুষের মানসিকতাও ডিজিটাল পর্যায়ে উন্নীত হবে, তাই মনে করছি কেউ আর জরুরি সেবাখাতের লোকেদের সাথে এনালগ মশকরা করবে না। যেমন আগে ফায়ার ব্রিগেডে ফোন করে কেউ কেউ বলতো, আগুন লেগেছে আগুন। কোথায় জানতে চাইলে বলতো ‘আমার হৃদয়ে’। ভাবুন তো হৃদয় নিয়ে কতো বড় হৃদয়হীন ফাজলামো! এবার শুনুন জরুরী সেবা খাতে ডিজিটাল পদ্ধতির ছোয়া কিভাবে পড়তে পারে। ধরুন, আরিচার কোথাও একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। এখনতো রাস্তার চলমান গাড়ি থামিয়ে এনালগ অ্যাম্বুলেন্স বানিয়ে জোড়া তালি দিয়ে মানুষ রক্ষার চেষ্টা করা হয়। দেশে ডিজিটালায়ন ঘটলে কি ঘটতো সেখানে-
আবুল নামের এক ব্যক্তি ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স আসতে বলছে।
হ্যালো, আমি আরিচা রোডের কান্নি থেকে আবুল বলছি (কান্নি মানে কোণা থেকে। আমাদের দেশেতো রাস্তা ঘাটের নাম্বার থাকে না। তাই কোণা, ঐ মুড়া মানে ঐ পাশে, জল খাবারের নীচে ইত্যাকার বিশেষণ জোড়া লাগিয়ে নিজের অবস্থান বোঝাতে হয়)। জলদি কইরা অ্যাম্বুলেন্স লাইয়া আসেন। একটা সিরিয়াস অ্যাকসিডেন্ট হইছে। মানুষজন মারাতœক আহত।
অ্যাম্বুলেন্স এলো। সাথে ডিজিটাল টিভির (ডিটি) সাংবাদিকরাও এলো সংবাদ সংগ্রহের জন্য।
ডিটি: হ্যালো আবুল সাহেব, আপনিই এই দুর্ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী। বলুনতো দুর্ঘটনার কারণ কি?
আবুল: আবার জিগায়। আমাগো রাস্তা কি মিনাক্ষীর (বোম্বের নায়িকা) গালের লাহান পিছলা (মসৃন) নাকি যে চুমা দিয়া সরসর কইরা সামনে যাইবো গাড়ি। বুড়া মাইনসের মতো খর খইরা রাস্তায় কতোক্ষণ গাড়ি সামনে যাইবার পারে। তাইতো গাড়ি হালায় টায়ার্ড হইয়া পাশের ডোবায় ডুব দিছে।
ডিটি: ও আচ্ছা বুঝলাম, রাস্তার অবস্থা ভাল নয়। তো, এই মুহুর্তে যোগাযোগ মন্ত্রীর কি করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আবুল: হালার সাংবাদিক বলদ নি! কি আর করবো, সোজা আল বিদা!
ডিটি: বলতে চাচ্ছেন ওনার পদত্যাগ করা উচিত। উনি কি সেটা করবেন?
আবুল: দ্যাখেন মিঞারা। ওনাকে আমি ন্যাংটো কালৃ..
ডিটি: ল্যাংগুয়েজ প্লিজ! এভাবে সম্মানিত মন্ত্রীকে ‘ওটা’ করবেন না।
আবুল: আরে মিঞা, কথার মাঝে কথা। আমি কইতাছি যে, আমি ওনারে জন্মের পর থিক্কা চিনি। গন্ডারের সাথে ওনার একটা বিশেষ মিল আছে।
ডিটি: বোঝা গেল। আর না। মূল কথায় আসুন।
আবুল: আর যাই হোক, উনি একজন ভালো ফাইটার।
ডিটি: মানে, উনি একজন ফ্রিডম ফাইটার ছিলেন?
আবুল: কইতে দ্যান। আমাগো মন্ত্রী ভাল কইরা জানেন, কি কইরা সব সমালোচনাকে তুড়ি মাইরা ভাংগা চেয়ারে শক্ত হইয়া বইয়া থাকোন লাগে। ক্যান মিঞারা, ঘাড়ে ব্যথা পাইয়াও বুঝবার পারেন নাই? কি ফাইটটা দিলো সাংবাদিক ভাইগো লগে! কতো কিছুইতো লিখলেন। কই, কিছুই তো করবার পারলেন না।
(সাংবাদিকরা যে যার ঘাড়ে হাত দিয়া ব্যথাটা পুনরায় উপলব্ধি করার চেষ্টা করলেন)
আরে মিঞারা, ঐ যে সেদিন উনি আর ওনার বন্ধু মন্ত্রী দুইজন মিল্যা হগোল সাংবাদিগকো ঘাড় ধাক্কা দিয়া বাইর কইরা দিলো না! আপনারাই তো খবরটা পত্রিকায় ছাপলেন।
সাংবাদিকরা বুঝে গেলেন বাতাস এবার তাদের দিকে ঘুরে গেছে। কথা এখন না বাড়ানোই ভাল।
ডিটি: আবুল ভাই আমাদের হাতের সময় শেষ। দেশবাসী ভাল থাকবেন। সাক্ষাৎকার দেবার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
আমাদের এখনই অন্য একটা দুর্ঘটনার খবর সংগ্রহে মতলব যেতে হচ্ছে। রাস্তার যে অবস্থা। দোয়া করবেন আবুল ভাই যেন ভাল থাকি!

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: ‘এতোদ্বারা পাঠক সাধারণকে জানানো যাইতেছে যে, যদি কেউ লেখাটি পড়িবার সময় ভো ‘দৌড় আবুলকে’ ’ভোদর আবুল’ পড়িয়া ফেলেন তবে নিশ্চিত তাকে আইনের হাতে সোপদ© করা হইবে।’
যেখানেই নিষিদ্ধ গন্ধ সেখানেই মানুষের ভীর। তাই সিগারেটের গায়ে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মৃত্যুর কথা স্মরন করিয়ে দিলেও মানুষ টাকা দিয়ে সিগারেট কিনতে ভুলে না। আমিও লেখাটি পড়তে পাঠককে প্রলুব্ধ করার জন্য শুরুতেই একটা বিজ্ঞপ্তি সেটে দিলাম যাতে পাঠকরা নিষিদ্ধ গন্ধের খোঁজে পুরো লেখাটা পড়ে ফেলেন।
আমাদের মন্ত্রী আবুল সাহেবেরও নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি রয়েছে দুর্নিবার নেশা। পদ্মা সেতু গর্ভে থাকাকালীন সময়েই তিনি এমন কর্মই করলেন যে, জন্মের পূর্বেই পদ্মা সেতুর মৃত্যু ঘটলো। যে যাই বলেন, আবুল ভাইয়ার মন্ত্রী হবার ইতিহাস ফাস করে দিয়ে দীর্ঘদিন সংবাদপত্রের পাতা বিভিন্ন খবর দিয়ে দখল করে রাখা আবুল যুগের আপাত অবসান ঘটিয়ে রনি এখন বাঙলায় হিট। ওদিকে রনি বোমায় আবুল সাহেবের কিছু না হলেও দলের সব নেতা কর্মীরা পাবলিক সামালোচনার ভয়ে ফিট।
রনি ব্রাদার কি বোম্ব ফাটালে তুমি!
কেপে উঠে দল, সাথে বাঙলার ভূমি।
সব পত্রিকা গরম এখন সেই খবরে। ওদিকে শাসক দলের বড় নেতা, মাঝারী নেতা, ছোট নেতা সবারই মাথার চান্দি চৈত্র মাসের ঠা ঠা রৌদ্রের মতো উত্তপ্ত। দৌড়ের এতো মাজেজা কে জানতো আগে। মন্ত্রী নির্বাচনের এই সহজ পদ্ধতি আগে জানা থাকলে শাসকদলগুলোর এতো পেরেসানিতে পড়তে হতো না। এখন থেকে ‘ক্ষুদে গানরাজ” কিংবা ‘ক্লোজআপ তোমাকেই খুঁজছে’ আদলে দৌড় প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যোগ্যমন্ত্রী নির্বাচন করা যেতে পারে। মন্ত্রী নির্বাচনে ব্যক্তির বুদ্ধি কিংবা লাজ লজ্জা থাকার দরকার নাই। শুধুমাত্র বাঁশীর সুরে কষে দৌড় দিয়ে প্রথম হতে পারলেই চলবে।
দুধভাত মন্ত্রী আবুল
আবুল সাহেব বলেছেন, যোগাযোগমন্ত্রীর কাজ করেও তার অনেক সময় বেচে যায়। কাজেই আরো দুচারটা মন্ত্রীত্ব এক সাথে দিলে ক্ষতি নাই। কিন্তু তার অন্য দুটো বক্তব্য বলে ভিন্ন কথা। তিনি বলেছেন, পদ্না সেতুর দুর্নিতি হয়ে থাকলে ওটা তিনি করেননি, অন্যকেউ করেছে। ‘অন্য কেউ’ যেহেতু করেছে, তাই দুর্নিতিও হয়েছে। তিনি ঘুরিয়ে হলেও স্বীকার করে নিলেন বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ১০০ ভাগ হালাল সাবানের মতো খাঁটি। এই অন্য কেউটা কে?
‘আমি করি নাই’,
কে করেছে তবে?
হুদার উপর ব্লেম(Blame)।
পদ্মা সেতুর
চোরকে বলি
শেম তোমাকে শেম!!!
উপরের দিকে থুতু ছিটালে তা নিজের গায়েই পড়ে; আবুল না বুঝলেও তার নেত্রী ঠিকই বুঝেছেন। তাই পাবলিক বুঝার আগেই তড়িঘড়ি করে দোষটা বেহুদা নামে খ্যাত বিগত যোগাযোগ মন্ত্রী নাজমুল হুদার ঘাড়ে চাপিয়ে পাড় পাইতে চাইছেন। কিন্তু একাবিংশ শতাব্দীর এই যুগে সব কিছুই এতো ঠুনকো যুক্তির মাধ্যমে চালিয়ে দেয়া যায় না। জনগণ তিনবেলা না খেতে পারলেও দিনে অন্তত: একবার যেহেতু ভাত খায় কাজেই আসল ঘটনা বুঝার ক্ষমতা রাখে। কথার ফাঁদে আটকে গেলে রেজাল্ট ছাড়া মুক্তি নেই। এখন শেখ হাসিনাকে প্রমান অবশ্যই হাজির করতে হবে যে, হুদাই দুর্নিতির নায়ক। প্রমাণ করতে পারলে সেটা হবে বিরোধী দলের জন্য বড় ধাক্কা, ব্যথ© হলে ‘ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না’। যদিও বিশ্বব্যাংক বর্তমান সরকারের মন্ত্রীর দিকে আঙুল উচিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেই নিজের কথার জালে আটকে গেছেন এখন। তিনি যদি চুপচাপ থাকতেন, দেশবাসী সন্দেহজনক অবস্থান নিয়ে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচালে থেকে এক সময় ইস্যুটা বেমালুম ভুলে যেত। সেই সুযোগে সরকার হয়তো পার পেয়ে যেত পদ্মা সেতু দুর্নিতির কলংক থেকে। আবুল সাহেবের ‘আমি করি নাই’ এবং প্রধানমন্ত্রীর ‘হুদা ব্লেম’ প্রমাণ করে দুর্নীতি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর জন্য পরিস্থিতি এখন পয়েন্ট অব নো রিটান©| হয় দুর্নিতির কলংক টিপ পরতে হবে, না হয় যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হাজির করে টিপটা বিরোধী দলকে পরাতে হবে। অভিযোগটা এসেছে বিশ্বব্যাংক থেকে যে কিনা বিশ্বের মুনাফোখোরদের বস। কথার তীরটা বিরোধী দলের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন এমন আরেকজন ব্যক্তিত্ব যিনি বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী। কাজেই এই অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ কথার কথা বলে চালিয়ে দেবার কোন উপায় নেই।
এই ডামাডোলের ভিতর আবুল সাহেব হাসের চরিত্র নিয়ে বললেন, দুর্নীতি হলেও আমি করি নাই। হাস পানিতে নামলেও ডাঙায় উঠে গা ঝারা দিলেই গায়ে কোন পানি থাকে না। আবুল সাহেবও ভেবেছেন, যে দেশে দুর্নিতি ছাড়া সুনীতির দেখা খুব কম মেলে সেদেশের জনগণও এসব ঘটনায় অভ্যস্ত। ‘করি নাই’ বললেই সব ধামাচাপা দেওয়া যাবে। ধরলাম, তিনি দুর্নিতি করেন নাই। যে ব্যক্তি নিজের মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি ঠেকাতে পারেন না সে কি করে আরো দু’চার মন্ত্রণালয়ের বাড়তি দায়িত্ব পাবার আশা করে।
তার সে আশায় গুড়ে বালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু প্রকল্প যোগাযোগ মন্ত্রনালয় থেকে সরিয়ে নিজের দায়িত্বে নিয়ে নিয়েছেন। অবশ্য যে বস্তার আম ইতিমধ্যে গায়েব করে ফেলা হয়েছে সেই বস্তা জব্দ করে লাভ কি! তবে কাজ একটা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ সরিয়ে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রকারান্তরে দুটো বিষয় স্বীকার করে নিলেন। প্রথমতঃ দুর্নীতির কথা এবং দ্বিতীয়ত, আবুল সাহেবের অযোগ্যতার কথা।
আবুল সাহেব অন্য একটা বক্তব্যে বলেছেন, তিনি পদত্যাগ করতে চাইলেও পদত্যাগ নাকি তার হাতে নেই। সেটা আমরা বুঝতে পেরেছি। দৌড়ের বাঁশী যেহেতু অন্যের হাতে, থামানোর লাল দড়িতো কাউকে না কাউকে অন্য মাথায় ধরে রাখতে হবে। কি অসহায় আমাদের মন্ত্রী। বাঁশী ছাড়া দৌড়াতেও পারে না, আবার লাল দড়ি ছাড়া থামতেও পারে না। উনি কি করে সড়কের বেহাল দশার উন্নতি করবেন। উনি যে শক্তির ছায়া যেতে হবে সেই শক্তির কাছে। দুধভাত মন্ত্রীর পিছনে ছুটে লাভ নেই।
দৌড় ফ্যান্টাসি
দৌড়ের এই মাজেজার জনপ্রিয়তাকে পুজি করে ব্যবসায়িকেরা মন্ত্রীর নামে এনার্জি ড্রিংক বের করতে পারেন। সেই পণ্যের বিজ্ঞাপনটা কেমন হতে পারে?
একটি মেয়ে ফোনে কথা বলছে আর নেচে নেচে গাইছে, ‘ক্রিং ক্রিং ক্রিং। আবুল এনার্জি ড্রিংক।’
এরপরে নেপথ্যে ভরাট কন্ঠে বলতে শুনা যাবে, ‘হ্যা ভাই। আবুল এনার্জি ড্রিংক। দৌড়ে জিতে একশত ভাগ মন্ত্রী হবার নিশ্চয়তা।’
পুনশ্চ: জনগণকে নিয়ে মশকরা করার অভ্যাস আমাদের রাজনীতিবিদদের গেল না। রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ দেশটাকে শুধু নিজের মনে করে। মন্ত্রীত্ত্বের মতো সম্মানজনক পদে দৌড় দেয়া কমেডিয়ানদের এনে জনগণকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার স্পর্ধা দেখায়। দেশ কোন খেলার ময়দান নয় যে ভো দৌড় দেওয়া খেলোয়াড় দিয়ে ভরে ফেলতে হবে।
দৌড়ে জিতে আবুল মিঞার
নেইতো কোন হুশ
দেশটা যেন মামার বাড়ী
মন্ত্রী লেবেনচুষ।
Copyright © 2013 MEDIA INFO